গত সপ্তাহে ঢাকা শহরের জাতীয় গ্রন্থাগার কমপ্লেক্সে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘জলে ডাঙায়’ উপন্যাসের উপর একটি পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানটি দেশের সাহিত্যপ্রেমী পাঠকদের মধ্যে বইটির ভ্রমণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক অন্তর্দৃষ্টিকে তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়োজিত হয়। উপন্যাসের মূল থিম—সমুদ্রযাত্রা, বিভিন্ন বন্দর ও সংস্কৃতির সাক্ষাৎ—কে কেন্দ্র করে আলোচনার মাধ্যমে পাঠকগণকে ভৌগোলিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যের প্রতি সংবেদনশীলতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক ও ছাত্রছাত্রীরা একত্রে বইটির কাঠামো, বর্ণনা শৈলী এবং লেখকের স্বভাবসুলভ রসবোধের বিশ্লেষণ করেন, যা দেশের পাঠ্য সংস্কৃতিতে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে।
‘জলে ডাঙায়’ উপন্যাসটি মুজতবা আলীর প্রথম ভ্রমণকাহিনী হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে তিনি মাদ্রাজ বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে সুয়েজ খাল, পোর্ট সইদ, কায়রো ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর পারাপার করেন। প্রতিটি বন্দরকে তিনি স্থানীয় মানুষের আচরণ, খাবার, সঙ্গীত ও ধর্মীয় রীতির মাধ্যমে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করেছেন। লেখকের বর্ণনা শৈলী সরল ও বৈঠকি, যা পাঠকের কল্পনাশক্তিকে ত্বরান্বিত করে এবং সমুদ্রযাত্রার অদ্ভুত মুহূর্তগুলোকে হাস্যরসের ছোঁয়া দিয়ে প্রকাশ করে। বইটি শুধুমাত্র ভৌগোলিক তথ্যের সংকলন নয়, বরং মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, যেখানে অপরিচিত সহযাত্রীদের সঙ্গে ভাগ করা ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে সামাজিক সংযোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
পাঠচক্রে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী রাহুল হোসেন বলেন, ‘এই উপন্যাসের মাধ্যমে আমি সমুদ্রযাত্রার রোমাঞ্চের পাশাপাশি মানবিকতা ও সহনশীলতার নতুন দিক শিখেছি।’ সাহিত্যিক মমতা চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘মুজতবা আলীর রসবোধ ও বৈঠকি ভাষা পাঠকে সহজলভ্য করে তুলেছে, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পাঠের প্রতি আগ্রহ জাগাতে সহায়ক।’ এছাড়া, গ্রন্থাগারিক শ্রীমতি সুমাইয়া দাসের মতে, এই ধরনের পাঠচক্রের আয়োজন পাঠকদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাধারা গড়ে তুলতে এবং দেশীয় সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অংশগ্রহণকারীরা বইয়ের বিভিন্ন অংশে আলোচিত সংস্কৃতিগত পার্থক্য ও সমুদ্রের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে সক্রিয় আলোচনা করেন, যা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে।
জাতীয় গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ এই পাঠচক্রকে সফল উদাহরণ হিসেবে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আকারে চালু করার পরিকল্পনা করেছে। তারা আগামী ছয় মাসে দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ‘জলে ডাঙায়’ ভিত্তিক পাঠশালা ও কর্মশালা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ভ্রমণমূলক সাহিত্য অনুধাবন করতে পারে। এছাড়া, গ্রন্থাগার কর্তৃক ডিজিটাল আর্কাইভে উপন্যাসের ই-বুক সংস্করণ উন্মুক্ত করা হবে, যা দূরবর্তী পাঠকদের জন্য সহজলভ্য হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের পাঠ্য সংস্কৃতিতে ভ্রমণকাহিনীর স্থানকে শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক সংলাপে বাংলাদেশের অবদান বাড়ানো লক্ষ্য করা হয়েছে।