বাংলাদেশের বিদেশি কর্মীদের অকালমৃত্যু সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। গালফ দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন শিল্পখাতে কাজ করা কর্মীরা হঠাৎ করে মৃত্যুবরণ করলে, সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ প্রায়শই রোগ, দুর্ঘটনা অথবা কাজের চাপকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে বাস্তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রায়শই যথাযথ তদন্তের অভাবে অজানা থাকে, ফলে পরিবার ও সমাজে অনিশ্চয়তা ও শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি কেবল মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, শ্রম নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিক থেকেও তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
বহু বছর ধরে বাংলাদেশ বিদেশি শ্রমিক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ২০২২ সালে মাত্র এক লক্ষাধিক কর্মী বিদেশে কাজের জন্য পেরিয়ে গিয়েছিল, যার মধ্যে গালফ দেশ, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের শিল্পখাত প্রধান। তবে পূর্বে ঘটে যাওয়া অকালমৃত্যুর ঘটনা—যেমন ২০১৯ সালে কাতারে এক গোষ্ঠী শ্রমিকের হঠাৎ মৃত্যু এবং ২০২১ সালে সৌদিতে কাজের সময় শ্বাসকষ্টে মারা যাওয়া কর্মী—দেখায় যে মৃত্যুর কারণের সঠিক যাচাইয়ের জন্য কোনো সমন্বিত প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। সরকারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃত্যুর কারণের ৬০ শতাংশই 'অজানা' বা 'অনুমানভিত্তিক' হিসেবে রেকর্ড হয়, যা তথ্যের স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার অভাবকে প্রকাশ করে।
মন্ত্রিপরিষদ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের মতে, “মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় না করা পর্যন্ত পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও সমর্থন প্রদান করা কঠিন”। শ্রম অধিকার সংস্থা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তারা দাবি করে যে বিদেশি কর্মীদের মৃত্যুর তথ্যের স্বতন্ত্র তদন্তের জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও তথ্য শেয়ারিং প্রোটোকল প্রয়োজন। পরিবারিক লোকজনের মুখে শোকের পাশাপাশি, কর্মসংস্থান বাজারে বিশ্বাসের ক্ষয়ও স্পষ্ট, যা ভবিষ্যতে শ্রমিক রপ্তানির পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, সঠিক কারণ জানলে কাজের পরিবেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব হবে।
অধিকর্তা এখন পর্যন্ত কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রথমত, মন্ত্রণালয় বিদেশি কর্মীদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক তথ্য বিনিময় চুক্তি পুনর্বিবেচনা করে, সংশ্লিষ্ট দেশের কনসুলেট ও শ্রম দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য স্বতন্ত্র মেডিক্যাল কমিটি গঠন করা হবে, যা আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণ ও পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে। তৃতীয়ত, পরিবারকে তৎক্ষণাৎ আর্থিক সহায়তা ও মানসিক পরামর্শ প্রদান নিশ্চিত করা হবে। শেষ পর্যন্ত, সরকার শ্রমিক রপ্তানির নীতি পুনরায় পর্যালোচনা করে, নিরাপদ কাজের পরিবেশ, স্বাস্থ্য বীমা ও জরুরি চিকিৎসা সেবার বাধ্যতামূলক শর্ত যুক্ত করবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে অকালমৃত্যুর প্রকৃত কারণ উন্মোচন ও পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।