ঢাকার জাতীয় চোখের গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ক্লিনিকাল ট্রায়ালটি দেশের চিকিৎসা ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক চিহ্নিত হয়েছে। গবেষকরা রোগীর বাম চোখের গ্যাংলিয়ন কোষে একক জিন থেরাপি ইনজেকশন প্রদান করেন, যার ফলে রোগী প্রথমবারের মতো আলো শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এই সাফল্যটি অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ—লুসিনের জিনের ঘাটতি—সম্পর্কিত রোগে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। ট্রায়ালটি আন্তর্জাতিক নৈতিক মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হয়েছে এবং তৎক্ষণাৎ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
লুসিনের জিনের ঘাটতি দ্বারা সৃষ্ট রেটিনাল ডেজেনারেশন বাংলাদেশে প্রায় দশ হাজারেরও বেশি রোগীকে প্রভাবিত করে আসছে, যার অধিকাংশই প্রাথমিক বয়সেই দৃষ্টিশক্তি হারায়। পূর্বে শুধুমাত্র সহায়ক চশমা ও লেন্সের মাধ্যমে সীমিত সমাধান প্রদান করা সম্ভব ছিল, তবে জিন থেরাপির গবেষণা গত দশকে বিশ্বব্যাপী দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সফল ক্লিনিকাল ফলাফল প্রকাশের পর, বাংলাদেশে স্থানীয় জিনোমিক্স গবেষণা দলগুলি স্থানীয় রোগীর জিনোম বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত ভেক্টর তৈরি করে। এই ভিত্তিতে গ্যাংলিয়ন কোষে সরাসরি জিন প্রবেশ করিয়ে কোষের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের পর রোগী ও তাদের পরিবারে উল্লাসের স্রোত বইয়ে গেছে। ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী ৪২ বছর বয়সী রমেশ চৌধুরী, যিনি দশ বছর আগে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন, তিনি প্রথমবারের মতো সূর্যের আলোতে হাত বাড়িয়ে দেখার সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাসি দিয়ে বলেছিলেন, “আবার আলো দেখেছি, জীবনের রঙ ফিরে এসেছে।” চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুমাইয়া রহমান, যিনি গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী, তিনি জিন থেরাপির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে জোর দিয়ে বলেছিলেন, “প্রাথমিক ডেটা দেখায় যে ইনজেকশনটি কোষের জিন প্রকাশে স্থিতিশীল পরিবর্তন আনছে, কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।” তবে কিছু সমালোচক এখনও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও খরচের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সরকারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ট্রায়ালের ফলাফল পর্যালোচনা করে জাতীয় স্তরে জিন থেরাপি ভিত্তিক দৃষ্টিশক্তি পুনরুদ্ধার প্রোগ্রাম চালু করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ভবিষ্যতে রোগীর বয়স, রোগের স্তর ও জিনের ধরন অনুযায়ী ব্যক্তিগতকৃত থেরাপি মডেল গড়ে তোলার জন্য অতিরিক্ত ক্লিনিকাল গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। এছাড়া, থেরাপির উৎপাদন ও বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে, যা রোগীর নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী মূল্যের নিশ্চয়তা দেবে। এই পদক্ষেপগুলো দেশের দৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত রোগে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান প্রদান করে আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলাদেশের চিকিৎসা গবেষণার অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।