বাংলাদেশে শিশু‑কিশোরদের স্বাস্থ্যের ধারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটকীয় পরিবর্তন দেখেছে। অতীতে অপুষ্টি ও কম ওজনের সমস্যা প্রধান ছিল, তবে ইউনিসেফের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী এখন অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার শিকার শিশুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত দেশের ১০–১৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে স্থূলতার হার ৩.২ শতাংশ থেকে ৭.১ শতাংশে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নয়, দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকি, মানসিক চাপ এবং শিক্ষাগত পারফরম্যান্সের ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে। বিশেষত নগর ও উপশহরী এলাকায় ফাস্ট ফুডের সহজলভ্যতা, উচ্চ ক্যালোরি সমৃদ্ধ প্যাকেট খাবার এবং স্ক্রিন সময়ের বৃদ্ধি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
শিশু‑কিশোরদের স্থূলতার মূল কারণগুলো বহুমুখী এবং সামাজিক‑অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অতিবর্ধিত নগরায়ণ, পরিবারে একক আয়ভিত্তিক গৃহস্থালির বৃদ্ধি এবং পিতামাতার কাজের চাপের ফলে শিশুরা ঘরে বেশি সময় কাটিয়ে টেলিভিশন, স্মার্টফোন এবং গেমিং ডিভাইসে যুক্ত হয়। পাশাপাশি, স্কুলে শারীরিক শিক্ষা ও খেলাধুলার সময় কমে যাওয়ায় দৈনন্দিন শারীরিক ক্রিয়াকলাপের সুযোগ হ্রাস পেয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া খাবারের পরিবর্তে দ্রুত প্রস্তুত করা চিপস, নুডলস, মিষ্টি পানীয় ইত্যাদি উচ্চ চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবার অধিকাংশ শিশুর খাবার তালিকায় স্থান পেয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো একত্রে ক্যালোরি গ্রহণের অতি বৃদ্ধি এবং শক্তি ব্যয়ের হ্রাস ঘটিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেছেন, স্থূলতা এখন দেশের শীর্ষ দশটি জনস্বাস্থ্যের সমস্যার মধ্যে অন্যতম এবং তা মোকাবিলার জন্য সমন্বিত নীতি প্রয়োজন। শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ রেহানা বলছেন, ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয়কর ফলাফল বয়ে আনতে পারে, তাই জীবনযাত্রার পরিবর্তনই একমাত্র টেকসই সমাধান। পিতামাতা ও শিক্ষকদেরও এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে; বেশ কিছু পিতামাতা জানান, সন্তানদের খাবার নির্বাচন ও ব্যায়াম সম্পর্কে তথ্যের অভাবে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এনজিও ‘শিশু স্বাস্থ্য সেবা’ সংস্থা সম্প্রতি একটি জরিপে প্রকাশ করেছে, স্থূলতার শিকার শিশুরা আত্মবিশ্বাসের অভাব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং শারীরিক অসুবিধা অনুভব করে, যা তাদের শিক্ষাগত ও মানসিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।
সরকার ইতিমধ্যে স্কুলে স্বাস্থ্যকর খাবার সরবরাহ, দৈনিক শারীরিক শিক্ষা ঘন্টা বৃদ্ধি এবং পুষ্টি শিক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের শেষের মধ্যে সব সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে কমপক্ষে ত্রিশ মিনিটের শারীরিক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ফাস্ট ফুডের বিজ্ঞাপন সীমিত করা, প্যাকেট খাবারের লেবেলিং কঠোর করা এবং কম আয়ের পরিবারকে পুষ্টিকর খাবার সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহের জন্য সাবসিডি প্রদান করবে। বিশেষজ্ঞরা আশা প্রকাশ করছেন, এই সমন্বিত পদক্ষেপগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী দশকে শিশু‑কিশোরদের স্থূলতার হার স্থিতিশীল বা হ্রাস পেতে পারে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের ভিত্তি মজবুত হবে।