সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহান গতকাল জাতীয় টেলিভিশন আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি হলো বিদেশে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, এই মানবসম্পদকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সঠিকভাবে ব্যবহার করা না হলে, বর্তমান প্রবৃদ্ধি মডেলটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সোবহানের এই মন্তব্য দেশের যুবক-যুবতীদের মধ্যে ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা হতাশা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য তাত্ক্ষণিক সতর্কতা রূপে কাজ করবে।
বহিরাগত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় দুই কোটি ছয় লক্ষেরও বেশি, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। ঐতিহাসিকভাবে, এই সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই পেশাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ, তবে দেশের সঙ্গে সংযোগের মাত্রা সীমিত ছিল। পূর্বে সরকার কেবলমাত্র রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক নীতি গড়ে তুলেছিল, যদিও রেমিট্যান্সের অবদান মোট জিডিপির প্রায় দশ শতাংশ। সোবহান উল্লেখ করেছেন যে, এই মানবসম্পদকে কেবল আর্থিক প্রবাহের বদলে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা দক্ষতা হিসেবে কাজে লাগানো হলে, দেশের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সোবহানের বক্তব্যের পর দেশীয় তরুণদের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা শুরু হয়েছে। বহু যুব সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি এই আহ্বানকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে, বিদেশে বসবাসরত তরুণদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন, তাদের দক্ষতা স্থানীয় শিল্পে সংযুক্ত করা এবং স্টার্ট‑আপ ইকোসিস্টেমে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে, কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে, নীতিগত কাঠামো না থাকলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে এবং রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে দূরে সরে আসা কঠিন হবে। বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও সোবহানের মন্তব্যের প্রশংসা করে বলেছেন যে, তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে তারা আরও উদ্দীপনা পাবেন।
সরকার ইতিমধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রথমত, বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য একক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের ইচ্ছা সংগ্রহ করা যায়। দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য বিশেষ নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে ট্যাক্স সুবিধা ও দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত। তৃতীয়ত, যুব উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা হবে, যেখানে বিদেশে সফল বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা সরাসরি পরামর্শ দেবেন। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগগুলোকে সমন্বিত করে একটি সমন্বিত জাতীয় ডায়াস্পোরা নীতি গঠন করা হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রবৃদ্ধি মডেলকে রূপান্তরিত করে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে সহায়তা করবে।